CHANNEL H TV

মাদ্রাসা কি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, নাকি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার? আনোয়ারকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ



মাদ্রাসা কি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, নাকি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার? আনোয়ারকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

ধর্মীয় পরিচয় নয়, প্রশ্ন হোক কাজের। পদ-পদবি নয়, গুরুত্ব পাক ধর্মীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে জবাবদিহি। 

অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ রোধ নয়, চাই সত্যের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—এমন প্রশ্ন সামনে রেখে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার পরিচালক ও সভাপতি মো. আনোয়ারকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার পরিচালনা, শিক্ষকদের সঙ্গে আচরণ, একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা, ঘনিষ্ঠ একজন শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে অন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সমালোচনাকারীদের লক্ষ্য করে কথিত ফেক আইডির মাধ্যমে আক্রমণাত্মক প্রচার চালানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে।

নতুন করে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, মাদ্রাসার তহবিলের অর্থ ব্যয় করে আনোয়ার নিজের ব্যক্তিগত নামে সম্পদ ক্রয় করেছেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তহবিলের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ ক্রয়ের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা জরুরি।

অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললেই কি চাকরিচ্যুতি?

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার পরিচালনা কিংবা কথিত অনিয়মের বিষয়ে কোনো শিক্ষক কথা বললে বা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়; এমনকি চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁদের প্রশ্ন, একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা যদি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতে না পারেন, তাহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো শিক্ষক অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাঁর অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার পরিবর্তে চাকরিচ্যুতির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্য, চাকরিচ্যুতির নোটিশ এবং পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একতরফা সিদ্ধান্ত, শিক্ষকদের প্রভাবিত করার অভিযোগ

আনোয়ারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষককে তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে রেখে ওই শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে অন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

তাঁদের অভিযোগ, কোনো শিক্ষক পরিচালনাগত অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তাঁর বিষয়ে ওই শিক্ষকের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিরোধ, পরিচালনাগত সমস্যা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে বিরূপ আচরণের কারণে শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ফেক আইডিতে আক্রমণের অভিযোগ

আনোয়ারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাকারীদের লক্ষ্য করে কথিত ফেক আইডির মাধ্যমে আক্রমণাত্মক প্রচারের বিষয়টিও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার পরিচালনা কিংবা আনোয়ারের কথিত অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে লক্ষ্য করে পাল্টা প্রচার শুরু হয়। তাঁদের অভিযোগ, আনোয়ারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তি ও কথিত সমর্থক বিভিন্ন ফেক আইডির মাধ্যমে সমালোচনাকারীদের পোস্টে কটূক্তি, আক্রমণাত্মক মন্তব্য এবং নেতিবাচক প্রচারে জড়িয়ে পড়েন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে আগ্রহী ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে হয়রানি বা বিব্রতকর পরিস্থিতির আশঙ্কা করেন। এ ছাড়া ফেক আইডি পরিচালনাকারীদের সঙ্গে আনোয়ারের যোগাযোগ বা সহযোগিতার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।

প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগের জবাব তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সমালোচনাকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের মুখে ফেলার অভিযোগ?

ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে মাদ্রাসার প্রচার

অভিযোগকারীদের দাবি, ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের ছবি-ভিডিও আনোয়ার তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল আইডিতে প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বা অ্যাকাউন্ট না থাকায় কার্যক্রমের প্রচার ব্যক্তিগত আইডিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—মাদ্রাসার নিজস্ব আনুষ্ঠানিক পেজ বা অ্যাকাউন্ট আছে কি না, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের তথ্য কে প্রকাশ করেন, শিক্ষার্থীদের ছবি-ভিডিও ব্যবহারের যথাযথ অনুমতি নেওয়া হয় কি না এবং প্রতিষ্ঠানের নামে সংগৃহীত অর্থের হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়।

ব্যক্তিগত আইডিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম প্রচার করাই অনিয়মের প্রমাণ রয়েছে । তবে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, অর্থ ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

মাদ্রাসার ফান্ডের অর্থে ব্যক্তিগত নামে সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগ

মাদ্রাসার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের অভিযোগ, ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার ফান্ডের দিয়ে তার ব্যবসা পরিচালনা মাদ্রাসার ফান্ডের অর্থ ব্যয় করে আনোয়ার নিজের ব্যক্তিগত নামে সম্পদ ক্রয় করেছেন।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানের তহবিলের অর্থ যদি ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন, হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের নথি কোথায়?

অভিযোগটি গুরুতর হওয়ায় মাদ্রাসার তহবিলের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ ক্রয়ের দলিল, অর্থের উৎস এবং পরিচালনা কমিটির অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন। সম্পদটি কার নামে নিবন্ধিত, সেটি ক্রয়ে ব্যবহৃত অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং তহবিলের অর্থের সঙ্গে লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব।

তবে ব্যক্তিগত নামে সম্পদ থাকা একাই মাদ্রাসার অর্থ ব্যবহারের প্রমাণ, অর্থের উৎস ও লেনদেনের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। 

অনুদানের অর্থ ও আর্থিক স্বচ্ছতা কোথায়?

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসাটি বিভিন্ন ব্যক্তির দেওয়া অর্থ ও অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাঁদের প্রশ্ন, অনুদানদাতাদের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তার হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় কি না।

আয়-ব্যয়, অনুদান গ্রহণ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং আর্থিক সিদ্ধান্তের তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছে কতটা উন্মুক্ত, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

সামাজিক অনিয়মের বিরুদ্ধে ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

আনোয়ারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন জ্ঞানমূলক ও ধর্মীয় পোস্ট প্রকাশ করলেও এলাকার মাদক, সুদের কারবার, দুর্নীতি এবং কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাঁর দৃশ্যমান ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান না নেওয়ার কারণে তাঁর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রত্যাশিত—এমনটাই বলছেন অভিযোগকারীরা।

দীর্ঘদিন ধরে পদ-পদবি বহাল, জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?

অভিযোগকারীদের দাবি, নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের মধ্যেও আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসার পরিচালক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ধর্মীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া, পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং প্রতিষ্ঠানে তাঁর ব্যক্তিগত অবদান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, পরিচালনাগত অভিযোগ, শিক্ষক বহিষ্কার নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত হয়রানি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের পরও প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারের বাড়ি বেগমগঞ্জ উপজেলার নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চৌকিদার বাড়ি এলাকায়। তিনি মোস্তফার ছেলে।

ধর্মীয় পরিচয় নয়, প্রশ্ন হোক কাজের

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির একক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হওয়া উচিত নয়। ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার পরিচালনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, অনুদানের হিসাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

আনোয়ারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, শিক্ষকদের বক্তব্য শোনার সুযোগ, আর্থিক হিসাব যাচাই এবং পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

মূল প্রশ্ন—ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?


প্রতিষ্ঠানের নাম: ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসা

ঠিকানা: ১০ নম্বর নরোত্তমপুর ৩ নং ওয়ার্ড বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী।

আপনার মতামত লিখুন

CHANNEL H TV

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


মাদ্রাসা কি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, নাকি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার? আনোয়ারকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ধর্মীয় পরিচয় নয়, প্রশ্ন হোক কাজের। পদ-পদবি নয়, গুরুত্ব পাক ধর্মীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে জবাবদিহি। 

অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ রোধ নয়, চাই সত্যের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—এমন প্রশ্ন সামনে রেখে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার পরিচালক ও সভাপতি মো. আনোয়ারকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার পরিচালনা, শিক্ষকদের সঙ্গে আচরণ, একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা, ঘনিষ্ঠ একজন শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে অন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সমালোচনাকারীদের লক্ষ্য করে কথিত ফেক আইডির মাধ্যমে আক্রমণাত্মক প্রচার চালানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে।

নতুন করে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, মাদ্রাসার তহবিলের অর্থ ব্যয় করে আনোয়ার নিজের ব্যক্তিগত নামে সম্পদ ক্রয় করেছেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তহবিলের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ ক্রয়ের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা জরুরি।

অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললেই কি চাকরিচ্যুতি?

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার পরিচালনা কিংবা কথিত অনিয়মের বিষয়ে কোনো শিক্ষক কথা বললে বা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়; এমনকি চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁদের প্রশ্ন, একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা যদি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতে না পারেন, তাহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো শিক্ষক অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাঁর অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার পরিবর্তে চাকরিচ্যুতির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্য, চাকরিচ্যুতির নোটিশ এবং পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একতরফা সিদ্ধান্ত, শিক্ষকদের প্রভাবিত করার অভিযোগ

আনোয়ারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষককে তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে রেখে ওই শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে অন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

তাঁদের অভিযোগ, কোনো শিক্ষক পরিচালনাগত অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তাঁর বিষয়ে ওই শিক্ষকের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিরোধ, পরিচালনাগত সমস্যা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে বিরূপ আচরণের কারণে শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ফেক আইডিতে আক্রমণের অভিযোগ

আনোয়ারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাকারীদের লক্ষ্য করে কথিত ফেক আইডির মাধ্যমে আক্রমণাত্মক প্রচারের বিষয়টিও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার পরিচালনা কিংবা আনোয়ারের কথিত অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে লক্ষ্য করে পাল্টা প্রচার শুরু হয়। তাঁদের অভিযোগ, আনোয়ারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তি ও কথিত সমর্থক বিভিন্ন ফেক আইডির মাধ্যমে সমালোচনাকারীদের পোস্টে কটূক্তি, আক্রমণাত্মক মন্তব্য এবং নেতিবাচক প্রচারে জড়িয়ে পড়েন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে আগ্রহী ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে হয়রানি বা বিব্রতকর পরিস্থিতির আশঙ্কা করেন। এ ছাড়া ফেক আইডি পরিচালনাকারীদের সঙ্গে আনোয়ারের যোগাযোগ বা সহযোগিতার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।

প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগের জবাব তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সমালোচনাকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের মুখে ফেলার অভিযোগ?

ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে মাদ্রাসার প্রচার

অভিযোগকারীদের দাবি, ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের ছবি-ভিডিও আনোয়ার তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল আইডিতে প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বা অ্যাকাউন্ট না থাকায় কার্যক্রমের প্রচার ব্যক্তিগত আইডিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—মাদ্রাসার নিজস্ব আনুষ্ঠানিক পেজ বা অ্যাকাউন্ট আছে কি না, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের তথ্য কে প্রকাশ করেন, শিক্ষার্থীদের ছবি-ভিডিও ব্যবহারের যথাযথ অনুমতি নেওয়া হয় কি না এবং প্রতিষ্ঠানের নামে সংগৃহীত অর্থের হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়।

ব্যক্তিগত আইডিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম প্রচার করাই অনিয়মের প্রমাণ রয়েছে । তবে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, অর্থ ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

মাদ্রাসার ফান্ডের অর্থে ব্যক্তিগত নামে সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগ

মাদ্রাসার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের অভিযোগ, ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার ফান্ডের দিয়ে তার ব্যবসা পরিচালনা মাদ্রাসার ফান্ডের অর্থ ব্যয় করে আনোয়ার নিজের ব্যক্তিগত নামে সম্পদ ক্রয় করেছেন।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানের তহবিলের অর্থ যদি ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন, হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের নথি কোথায়?

অভিযোগটি গুরুতর হওয়ায় মাদ্রাসার তহবিলের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ ক্রয়ের দলিল, অর্থের উৎস এবং পরিচালনা কমিটির অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন। সম্পদটি কার নামে নিবন্ধিত, সেটি ক্রয়ে ব্যবহৃত অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং তহবিলের অর্থের সঙ্গে লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব।

তবে ব্যক্তিগত নামে সম্পদ থাকা একাই মাদ্রাসার অর্থ ব্যবহারের প্রমাণ, অর্থের উৎস ও লেনদেনের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। 

অনুদানের অর্থ ও আর্থিক স্বচ্ছতা কোথায়?

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসাটি বিভিন্ন ব্যক্তির দেওয়া অর্থ ও অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাঁদের প্রশ্ন, অনুদানদাতাদের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তার হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় কি না।

আয়-ব্যয়, অনুদান গ্রহণ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং আর্থিক সিদ্ধান্তের তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছে কতটা উন্মুক্ত, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

সামাজিক অনিয়মের বিরুদ্ধে ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

আনোয়ারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন জ্ঞানমূলক ও ধর্মীয় পোস্ট প্রকাশ করলেও এলাকার মাদক, সুদের কারবার, দুর্নীতি এবং কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাঁর দৃশ্যমান ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান না নেওয়ার কারণে তাঁর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রত্যাশিত—এমনটাই বলছেন অভিযোগকারীরা।

দীর্ঘদিন ধরে পদ-পদবি বহাল, জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?

অভিযোগকারীদের দাবি, নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের মধ্যেও আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসার পরিচালক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ধর্মীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া, পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং প্রতিষ্ঠানে তাঁর ব্যক্তিগত অবদান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, পরিচালনাগত অভিযোগ, শিক্ষক বহিষ্কার নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত হয়রানি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের পরও প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারের বাড়ি বেগমগঞ্জ উপজেলার নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চৌকিদার বাড়ি এলাকায়। তিনি মোস্তফার ছেলে।

ধর্মীয় পরিচয় নয়, প্রশ্ন হোক কাজের

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির একক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হওয়া উচিত নয়। ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার পরিচালনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, অনুদানের হিসাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

আনোয়ারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, শিক্ষকদের বক্তব্য শোনার সুযোগ, আর্থিক হিসাব যাচাই এবং পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

মূল প্রশ্ন—ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?


প্রতিষ্ঠানের নাম: ইমদাদুল উলুম নূরানী হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসা

ঠিকানা: ১০ নম্বর নরোত্তমপুর ৩ নং ওয়ার্ড বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী।


CHANNEL H TV

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ রাজিবুল হক রনি
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক:
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
মাদ্রাসা কি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, নাকি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার? আনোয়ারকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ
0:00 / 0:00
1x